মো. নূরে এলাহী:
দুই বছর আগে আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Ahsanullah University of Science and Technology – AUST) একদল তরুণ শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখেছিল—নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি একটি ন্যানো স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশের রয়েছে নিজস্ব স্যাটেলাইট; সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে এক সাহসী সূচনা।
কিন্তু প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল স্যাটেলাইট কম্পোনেন্টের উচ্চমূল্য। একটি পূর্ণাঙ্গ ন্যানো স্যাটেলাইটের প্রতিটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার গড় মূল্য প্রায় ৬০–৭০ লক্ষ টাকা। ফলে একটি সম্পূর্ণ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ২–৩ কোটি টাকা—যা ছাত্র পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অস্টের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসে এক নতুন চিন্তা নিয়ে—
কম খরচে নিজস্ব প্রযুক্তিতে স্যাটেলাইট কম্পোনেন্ট তৈরি করা।
এই ভাবনা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও EEE বিভাগের সহায়তায় ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম Satellite Communication Lab, যা পরবর্তীতে AUSTSat Nano Satellite Mission Project Team-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।
বর্তমানে প্রকল্পটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ধারাবাহিক গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দলটি ২০২৩ সালে তাদের তৈরি প্রথম 2U মেকানিকাল মডেল উপস্থাপন করে Bangladesh Satellite Company Limited (BSCL)-এর কাছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুন মাসে দলটি উন্নত 3U Nano Satellite Drop & Communication Range Test Model তৈরি করে, যা সফলভাবে অক্টোবরের ২ তারিখে On-site টেস্ট সম্পন্ন করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো
দলটি এমন একটি On-board Computer (OBC) তৈরি করেছে যার বাজারমূল্য সাধারণত প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা, অথচ তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে এর খরচ মাত্র ২৫,০০০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি ফাইনাল ভার্সনে ১ লক্ষ টাকার নিচে আনতে গবেষণা চলছে।
দলটির বিশ্বাস, সঠিক গবেষণা পরিবেশ ও মেন্টরশিপ পেলে বাংলাদেশেই এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট কম্পোনেন্ট বিদেশি মূল্যের মাত্র ৫% খরচে উৎপাদন করা সম্ভব।
প্রকল্পটির অ্যাডভাইজর হিসেবে রয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের তালিকাভুক্ত অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক, এবং প্রজেক্ট লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহ আল নাঈম।

প্রজেক্ট লিডার মো. আবদুল্লাহ আল নাঈম এর আগেও ছিলেন “তরী” ভাসমান বাড়ি প্রকল্পের উদোক্তা, যা বন্যাকবলিত এলাকার জন্য উদ্ভাবিত এক অনন্য সমাধান এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিল। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা American Concrete Institute (ACI)-এর AUST ACI Student Chapter-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে এই প্রকল্পে ১৮ জন শিক্ষার্থী যুক্ত আছেন এবং ইতোমধ্যে দলের দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আশরাফুল হকের নিকট হস্তান্তর করেন।