দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে একাধিক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদনির্ভর না হয়ে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধা, মননশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটবে।
মাহদী আমিন বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতায়ও সমানভাবে এগিয়ে যাক।”
তিনি জানান, শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা গড়ে তোলা হবে।
মাহদী আমিন বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়ের মাধ্যমে নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়গুলো শেখানো হবে।
তিনি আরও জানান, বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃষ্ট বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সমাধানে সরকার ধাপে ধাপে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন আনা হবে।
নতুন কারিকুলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন বই প্রণয়ন ও মুদ্রণের জন্য সীমিত সময় পাওয়া যাওয়ায় সব পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে আগামী বছর থেকে সংস্কার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। মাহদী আমিন জানান, আগামী কয়েক বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ বিষয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি দেশের শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। জানান, চলতি বছরের প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে, যা দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি বিকাশে ‘স্টার্ট-আপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ নামে একটি জাতীয় কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ কর্মসূচির আওতায় উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য সিড ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
কারিগরি শিক্ষার প্রসার সম্পর্কে মাহদী আমিন বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে স্কিলস কম্পিটিশন, ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং সরাসরি চাকরির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভিন্ন অধিদপ্তরের প্রধান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।