বিশ্ব সমুদ্র দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বঙ্গোপসাগর রক্ষায় শপথ নিয়েছেন শতাধিক তরুণ পরিবেশকর্মী, আন্তর্জাতিক গবেষক ও প্রশাসনিক নেতৃবৃন্দ।
“দূষণ প্রশমন এবং প্রবাল ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ”—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ, বন ফাউন্ডেশন, বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশন, সেভ আওয়ার সি এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশসহ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
গত ৮ জুন সকাল ১০টায় কক্সবাজারের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে ‘ব্লু ওয়েভ’ অ্যাকশনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় শতাধিক যুব স্বেচ্ছাসেবক সমুদ্র সৈকতে মানবপ্রাচীর তৈরি করেন এবং সৈকত থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করেন।
পরে অংশগ্রহণকারীরা কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ওশান ডে কনফারেন্স ২০২৬’-এ যোগ দেন। সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনার পাশাপাশি উপকূলীয় সমুদ্র রক্ষায় আগামী প্রজন্মকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে ডিজিটাল ‘ইউথ ফর ওশান’ প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন করা হয়।
সম্মেলনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের বিপর্যয়, সেন্টমার্টিন দ্বীপের চারপাশে বাংলাদেশের অনন্য প্রবাল ইকোসিস্টেমের দ্রুত ক্ষয় এবং পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা ও সৈকত দূষণের ফলে বিপন্ন অলিভ রিডলি সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশের সমন্বয়ক এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা—ধরার সদস্য সচিব শরীফ জামিল দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষায় জরুরি নীতিগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “বঙ্গোপসাগর কোনো সীমাহীন আবর্জনা ফেলার জায়গা নয়; এটি আমাদের দেশের জীবন্ত হৃদপিণ্ড। দেশের ভেতরের প্লাস্টিক বর্জ্য আর তদারকির অভাব যখন আমাদের সামুদ্রিক জীবনকে প্রতিনিয়ত শ্বাসরোধ করছে, তখন আমরা টেকসই ব্লু ইকোনমির কথা বলতে পারি না। আমাদের সমুদ্র বাঁচাতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগ, তাৎক্ষণিক দূষণ প্রশমন এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে সমুদ্র শাসন নিশ্চিত করতে হবে।”
মিশন গ্রিন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, “আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা আজ কেবল সমুদ্র সৈকত থেকে প্লাস্টিকই কুড়ায়নি; তারা পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছে।”
বাস্তুসংস্থান ও জলবায়ুগত ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ডেপুটি ডিরেক্টর রউফা খানম বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় দূষণ সেন্টমার্টিনে আমাদের প্রবাল ঐতিহ্যকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব। এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে উপকূলীয় জোনিং আইনে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা এবং জলবায়ু অভিযোজন মডেল অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”
আয়োজকরা জানান, বঙ্গোপসাগরকে প্লাস্টিক দূষণ, প্রবাল ক্ষয় ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয় থেকে রক্ষায় তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সমুদ্র সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারণে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।