ড. এম এম রহমান
প্রাথমিক শিক্ষা হলো একটি শিশুর জীবনের প্রথম সামাজিক কাঠামো। পরিবার থেকে বের হয়ে স্কুল প্রবেশের মধ্য দিয়েই একটি শিশু বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই সময়টাই তার মানসিক বিকাশ, কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস এবং শেখার আনন্দ তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু যদি এই সূচনালগ্নেই একটি শিশুর সামনে ‘পরীক্ষা’, ‘প্রতিযোগিতা’ এবং ‘বাছাই’ শব্দগুলো হাজির করা হয়, তাহলে সেই শিক্ষা কি সত্যিই মানবিক বলা যায়? এই প্রশ্ন আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কিছু নামকরা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করার প্রথা ছিল। পরে সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে লটারিভিত্তিতে ভর্তি ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থা চালুর অন্যতম যুক্তি ছিল—শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতার চাপ কমানো এবং শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আবার যদি ভর্তি পরীক্ষার দিকে ফিরে যাওয়া হয়, তাহলে তা শিশুদের জন্য কতটা উপযোগী হবে? এই প্রশ্ন নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে সবার সামনে আসছে।
শিশু মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষা গবেষণা বারবার দেখিয়েছে যে ৫-৬ বছরের একটি শিশুর মধ্যে সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যতে শেখার সক্ষমতা কোনো একদিনের পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব নয়। প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি সমান নয়; কেউ দ্রুত ভাষা শেখে, কেউ সংখ্যার প্রতি আগ্রহী হয়, কেউ আবার ছবি আঁকা বা গল্প বলায় বেশি দক্ষতা দেখায়। এই বৈচিত্র্যই শিশু বিকাশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সুইস মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জাঁ পিয়াজে শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে ছোট বয়সে শেখার প্রক্রিয়া মূলত খেলাধুলা, পর্যবেক্ষণ এবং কৌতূহলের মাধ্যমে ঘটে। এই বয়সে পরীক্ষামূলক মূল্যায়ন শিশুর স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আরেকজন বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড গার্ডনার তাঁর ‘বহুবিধ বুদ্ধিমত্তা’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে মানুষের বুদ্ধিমত্তা একমাত্র একাডেমিক পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় না; ভাষা, সংগীত, যুক্তি ও গাণিতিক, শারীরিক দক্ষতা, সামাজিক বোধ, মানবিকতা, প্রকৃতিবাদী, সৃজনশীলতা—সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ একটা শিশুর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে বিচার করা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ, এবং তা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অন্যতম বড় সমস্যা হলো—এটি শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পাঁচ বা ছয় বছরের শিশুকে কোচিং সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে অক্ষর, সংখ্যা, ইংরেজি শব্দ বা সাধারণ জ্ঞানে প্রশ্ন মুখস্থ করতে হয়। ফলে শেখা হয়ে ওঠে আনন্দের পরিবর্তে একটা চাপের বিষয়। শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই বয়সে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা শিশুর মধ্যে ভয়, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। কোনো শিশু যদি পরীক্ষায় ভালো না করে, তখন সে নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তে পারে; যা তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে প্রায় অবধারিতভাবে কোচিং সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে কোচিং নির্ভর প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে একটা বড় সামাজিক বাস্তবতা। ভর্তি পরীক্ষার কারণে প্রাথমিক পর্যায়েও একই ধরনের কোচিং বাণিজ্য তৈরি হতে পারে। এর ফলে কয়েকটা সমস্যা দেখা দেয়—শিক্ষা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে, অভিভাবকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে, শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলা ও সামাজিক বিকাশের সময় কমে যায়। ফলে শিক্ষা একটা আনন্দময় প্রক্রিয়া না হয়ে পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভর্তি পরীক্ষার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—এটি সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে। ধনী বা মধ্যবিত্ত পরিবার সহজেই কোচিং, অতিরিক্ত বই, ব্যক্তিগত শিক্ষক ইত্যাদি ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সেই সুযোগ থাকে না। ফলে পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বাভাবিক সুযোগকে সংকুচিত করে দেয়। এই কারণেই আন্তর্জাতিক শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষায় সমান সুযোগের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম ধাপটিই যদি বাছাই-পরীক্ষা এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শুরু হয়, তাহলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন নেই। ফিনল্যান্ডে সকল শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। এখানে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। নরওয়েতে শিক্ষার্থীরা সাধারণত তাদের নিকটবর্তী স্কুলে ভর্তি হয়। কানাডাতে প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষার পরিবর্তে শেখার পরিবেশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক। এখানে সরকারি স্কুলে সাধারণত ভর্তি পরীক্ষা নেই। সিঙ্গাপুরেও প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বেশ সুসংগঠিত। প্রাথমিকে ভর্তি হয় বিশেষ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; সাধারণত ভর্তি পরীক্ষা হয় না।অস্ট্রেলিয়ায় ভর্তি পদ্ধতি খুবই সরল। নিকটবর্তী সরকারি স্কুলে শিশুর ভর্তি নিশ্চিত করা হয়। কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। বেসরকারি বা চার্চ পরিচালিত স্কুলে মাঝে মাঝে সাক্ষাৎকার হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তি পদ্ধতি মূলত স্থানীয় স্কুল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। চার্টার বা প্রাইভেট স্কুলে, কিছু ক্ষেত্রে, লটারি বা সীমিত মূল্যায়ন হয়। আমাদের পাশের দেশে, ভারতে সরকারি স্কুলে ভর্তি সাধারণত পরীক্ষা-নির্ভর নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিকটবর্তী স্কুলে ভর্তি অনুসরণ করা হয়। অনেক শহরে লটারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
উন্নত দেশগুলোতে, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি সাধারণত নির্ভর করে—শিশুর বয়স, বাসস্থানের এলাকা, অনলাইন নিবন্ধন বা আবেদন, এবং সীমিত ক্ষেত্রের লটারি। অর্থাৎ অধিকাংশ দেশেই শিশুদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতা সাধারণ নিয়ম নয়। কারণ তাদের শিক্ষা নীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো: প্রাথমিক শিক্ষা হলো সবার জন্য সমান সুযোগ। এই দেশগুলোতে শিশুদের শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বিকাশকে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাধারণত একটা মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা কয়েকটা মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, শিশুর মানসিক বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া, শেখাকে আনন্দময় করা, এবং অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমানো। যদি শিক্ষাব্যবস্থার শুরুতেই কঠোর প্রতিযোগিতা আর বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চালু করা হয়, তাহলে এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন দেশে পর্যালোচনা করে, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে কয়েকটা বিকল্প পদ্ধতির কথা চিন্তা করা যেতে পারে—নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা, লটারি পদ্ধতি (যেখানে আসন সীমিত), শিশুদের জন্য পর্যবেক্ষণভিত্তিক মূল্যায়ন, এবং প্রাথমিক শিক্ষার মান সব স্কুলে সমান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। যদি সব স্কুলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কয়েকটা নির্দিষ্ট স্কুলে ভর্তি নিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতাও কমে যাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা একটা শিশুর জীবনের ভিত্তি। এই ভিত্তি যদি ভয়, চাপ এবং প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়ায়, তাহলে শিক্ষা তার মানবিক লক্ষ্য থেকে সরে যেতে পারে। প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়। তাদের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত ‘শিক্ষার্থী’ হিসেবে, ‘পরীক্ষার্থী’ হিসেবে নয়। শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিশুরা কৌতূহল নিয়ে শিখবে, আনন্দ নিয়ে প্রশ্ন করবে, এবং ধীরে ধীরে নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করবে। একটা মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে হলে প্রাথমিক শিক্ষার দরজাটা সকল শিশুর জন্য সমানভাবে খোলা থাকা জরুরি। ধনী কিংবা দরিদ্র, গ্রাম কিংবা শহর—সবাই যেন শিক্ষা শুরু করতে পারে একই মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক:
ড. এম এম রহমান
প্রফেসর, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
ই-মেইল: mijanjkkniu@gmail.com