রাবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর মর্যাদা, অধিকার ও সমাজে তাদের অবদানকে সম্মান জানাতে দিবসটি পালন করা হয়। ১৯১১ সালে প্রথমবারের মতো কয়েকটি দেশে নারী দিবস পালিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) নারী শিক্ষার্থীদের ভাবনা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন রাবিপ্রবি প্রতিনিধি মিজানুর রহমান।
নারী দিবস নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী চৈতি রুদ্র বলেন, নারী হচ্ছে সমাজের সর্বগুণে গুণান্বিত, আবেগময় কিন্তু অবহেলিত মানুষ। আজ নারী দিবসে আমি শুধু একদিনের বুলি ছড়াতে নয়, বরং নারীর আত্মসম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকারের বাস্তবিক দাবি নিয়ে বলতে এসেছি। প্রতিবারই আমরা দেখি, শুধুমাত্র ৮ই মার্চ এলেই নারীদের নিয়ে পত্রিকায় বড় বড় কলাম লেখা হয় এবং সুশীল সমাজের নানা বক্তব্য শোনা যায়।
একজন নারী হিসেবে আমি মনে করি, প্রতিটা নারীই সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রের কাছে আত্মসম্মান ও নিরাপদের সহিত আত্মমর্যাদা নিয়েই বাঁচতে চাই আজীবন। অথচ প্রতিনিয়ত নারীদের সম্ভ্রমহানি, বিচারবহির্ভূত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড আমাদের শঙ্কিত ও মর্মাহত করে তুলেছে। এর ফলে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছি।
তাই আজকের এই দিনে আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ চলাচল, রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান ও আত্মমর্যাদা নিশ্চিতকরণ এবং শ্লীলতাহানির ন্যায়বিচার দাবি করছি।
ক্ষণিকের নয়,বরং আমরা চাই নারীর স্থায়ী আত্মমর্যাদা ও নিরাপত্তা।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মাইশা আক্তার মীম জানান, বর্তমান সমাজে নারীর ক্ষেত্রে মূল কনসার্নিং বিষয় “নিরাপত্তা”। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তর – শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল প্লাটফর্মে নিরাপত্তার আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চাই। শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নারী দিবসকে না রেখে, চলুন অঙ্গীকারবদ্ধ হই নারীর মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যারিন ইবনাত বলেন, নারী দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়, বরং নারীদের প্রতি সম্মান, সমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের দিন –
“কোনোকালে একা নয় নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়েছে,শক্তি দিয়েছে, বিজয় লক্ষ্মী নারী।”
নজরুলের ভাষায় বলতে হয় নারী মানে শক্তি, নারী মানে অনুপ্রেরণা, নারী মানে বিজয়। কিন্তু আজ ২০২৬ এ পা দিয়েও আমরা যেন নারীকে তার যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ। আজও আমাদের নারীর প্রাপ্য অধিকারের জন্য লড়তে হয়,আজও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে,আমাদের নারীরা আজও ঘরে বাইরে নিরাপদ নয়। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো ধর্ষকের যথাযথ বিচার করা হয়নি।
সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি উন্নত সমাজ গড়তে নারী ও পুরুষের সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।তাই এই নারী দিবসে একজন নারী হিসেবে আমার চাওয়া, আগামীতে এই সমাজ হোক নারীর জন্য নিরাপদ ও সুন্দর।
ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগের উম্মে নাদিয়া তাবাসসুম বলেন, আমার কাছে নারী দিবস শুধু একটি দিবস নয়,
এ যেন পৃথিবীর কাছে এক নীরব স্মরণ। যে শক্তিকে বহুবার অবহেলা করা হয়েছে,সে শক্তিই আসলে জীবনের সুন্দরতম আলো।
নারী ভাঙে, কিন্তু ভাঙনের শব্দ পৃথিবীকে শুনতে দেয় না।
নারী কাঁদে,কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকিয়ে রাখে নতুন দিনের সাহস। সে বারেবার হেরেও আবার ফিরে আসে, আরও দৃঢ়, আরও আলোকিত হয়ে। হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় এ ধরা উপলব্ধি করবে,
নারী কোনো অধ্যায় নয়,
সে এক উপাখ্যান। পৃথিবী নামের এই মহাকাব্যের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে দীপ্তিময় পংক্তি।
তাই নারী দিবস আমার কাছে শুধু উদযাপন নয়, এ এক প্রতিজ্ঞা..নারীর স্বপ্নকে শ্রদ্ধা করার,তার মেঠোপথকে আলোকিত করার।কারণ নারী যখন মাথা তুলে দাঁড়ায়,তখন শুধু একজন মানুষ নয়..একটি সময়, একটি সমাজ, একটি ভবিষ্যৎ মাথা তুলে দাঁড়ায়।
ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের স্বপ্না চাকমা নারী দিবস নিয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, প্রতিটি নারীর স্বপ্ন উড়ুক স্বাধীন আকাশে।আজকের নারী, আগামী দিনের ইতিহাস। প্রতিটি নারীর জীবনে স্বপ্ন মানে শুধুই লক্ষ্য নয়, এটি তার স্বাধীনতার প্রতীক । আমাদের চাকমা সম্প্রদায় নারীরাও সাহসিকতা, পরিশ্রম আর ধৈর্যেরর
মাধ্যমে সমাজে আলোকস্তম্ভ হয়ে উঠেছেন। আমাদের কন্ঠে, আমাদের গল্পে, আমাদের সংস্কৃতিতে-সব জায়গায় নারীর শক্তি উজ্জ্বল হোক। পাহাড়ি বাতাসে, নদীর ঢেউয়ে, পাহাড়ি নারী স্বপ্ন যেন স্বাধীনভাবে উড়ে। যেখানে নারী কেবল স্বপ্ন দেখবে না, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করবে।
আজকের নারী দিবসে, আসুন আমরা উদযাপন করি, প্রতিটির নারীর শক্তি, সাহস এবং স্বাধীনতার উজ্জ্বল আলো। স্বপ্ন দেখো, সাহসী হও, উড়ো স্বাধীন আকাশে।