1. admin@thecampusinsight.com : Campus :
  2. news@thecampusinsight.com : news :
শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মচারীর হাতে শিক্ষক খুন—কেবল একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ নিটারে নতুন হল নির্মাণের লক্ষ্যে শুরু হয়েছে গাছ কাটা, বিলম্বে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আইবিএ-জেইউতে ৩৬তম উইকেন্ড এমবিএ ব্যাচের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে ইফতার করালো যবিপ্রবি প্রশাসন ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য জাবি শিবিরের বিশেষ ইফতার নিটার প্রশাসনের উদ্যোগে নিটারে জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত জবিস্থ যশোর জেলা ছাত্রকল্যাণের নবীন বরণ ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত রাবিপ্রবিতে ইফতার ও দোয়া মাহফিল নোবিপ্রবিতে ছাত্রী হলের নামাজ ঘরকে গণরুমে রূপান্তরের অভিযোগ শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতেই অনুষ্ঠিত হলো জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগের ইফতার মাহফিল

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মচারীর হাতে শিক্ষক খুন—কেবল একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬

ড. এম এম রহমান

গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ বদলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অসন্তোষ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নিয়োগে অনিয়ম, প্রশাসনিক পদ-পদবি কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও অযোগ্যকে পদায়ন। এসবের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা সহকর্মীদের মধ্যকার আস্থার জায়গা দুর্বল হয়েছে। আগে যেখানে মতভেদ থাকলেও তা আলোচনায় সমাধান হতো, এখন সেখানে দ্রুত ক্ষোভ জমে ওঠে এবং কখনও তা সহিংসতায় রূপ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী—সবাই একই সম্প্রদায়ের অংশ। কিন্তু যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহির পরিবেশ দুর্বল হয়, তবে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কখনও কখনও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তারই উদাহরণ হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস কক্ষে নিজ কর্মচারীর হাতে শিক্ষক খুন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনার নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের শুধু শোকাহত করেনি; এটি আমাদের মানসিক কাঠামো, কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, একটি বিভাগের সভাপতি অফিস টাইমে তার নিজের নিরাপদ অফিস কক্ষে নিজ কর্মচারীর হাতে হত্যাকাণ্ডেরে শিকার হওয়া—এই ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। এটি কেবল একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ

বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা সাধারণত নিরাপদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এখানে রয়েছে: প্রশাসনিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম ও অযোগ্য নিয়োগ, পদোন্নতি বা দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ‍ও ট্যাগিং, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, ও পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব। যদি কোনো ব্যক্তি নিজেকে অবমূল্যায়িত, বঞ্চিত বা অপমানিত মনে করেন, এবং তার অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তবে তার ভেতরে এক ধরনের অবিচারবোধ তৈরি হয়; যেখানে সে মনে করেন যে তার সাথে অন্যায়, অসম্মানজনক আচরণ করা হয়েছে এবং অন্যের কাজের কারণে তিনি কষ্ট ভোগ করছেন। যা দীর্ঘমেয়াদে আক্রমণাত্মক আচরণের অন্যতম বড় উৎস। যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন, এবং তার কোনো কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা না থাকে, তবে তিনি বাস্তবতা-বোধ হারিয়ে চরম পদক্ষেপ নিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে ব্যক্তিগত সংকট অদৃশ্য থাকে—যতক্ষণ না তা বিস্ফোরিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর সম্পর্ক মূলত একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত হয়। এখানে নীতিগত ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণত শিক্ষকের হাতে থাকে, আর কর্মচারী প্রশাসনিকভাবে অধীনস্থ অবস্থানে থাকেন। এই কাঠামো স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হলেও, সম্পর্কের ভেতরে যদি পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীলতা বজায় না থাকে, তাহলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাছাড়া, আমাদের সমাজে সহনশীলতার মাত্রা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতা ব্যবহার, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রবণতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতা—এসব মিলিয়ে এক ধরনের সহ্যক্ষমতাহীন সমাজ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবেশে মানুষ অপেক্ষা করতে শেখে না, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ শেখে না, সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চায় না, কিংবা মতভেদকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না। ফলে বিরোধ বা মতপার্থক্য দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার বদলে অনেকেই আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া, প্রতিশোধ বা আক্রমণাত্মক আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উভয়ের জন্যই গভীর ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; এটি বৃহত্তর সমাজেরই অংশ। তাই সমাজে যে মানসিক প্রবণতা, মূল্যবোধের সংকট বা সহনশীলতার অবক্ষয় দেখা দেয়, তার প্রতিফলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ঘটে। ক্যাম্পাসের মানুষগুলোও তো সেই সমাজ থেকেই উঠে আসে—তাদের মানসিকতা, আচরণ ও প্রতিক্রিয়া সমাজের সামগ্রিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে “নিজ কর্মচারীর হাতে শিক্ষক খুন”—এই ঘটনাটি আমাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-বোধকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা জ্ঞানচর্চার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভাবি; সেখানে নিজ অফিস কক্ষের ভেতর এমন নৃশংসতা ঘটবে—এটি কল্পনারও বাইরে ছিল। ফলে এটি শুধু একটি গুরুতর অপরাধ নয়, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ও মানসিক নিরাপত্তার ওপরও বড় আঘাত।

এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত জরুরি—শুধু আইনি দায় নির্ধারণের জন্য নয়, বরং বোঝার জন্য যে কীভাবে একজন মানুষ এমন চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তার মানসিক অবস্থা কী ছিল, কোনো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ বা দ্বন্দ্ব কাজ করছিল কি না, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোথাও অবহেলা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কারণ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, ভেতরের ভাঙনগুলোও চিহ্নিত করে সংস্কার করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হয়, তবে সেখানে দূরত্ব তৈরি হবে। কিন্তু যদি এটি মানবিক সম্পর্কের জায়গা হয়—তবে সংলাপ, সহমর্মিতা ও মানসিক সহায়তা থাকবে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দেয়—নিরাপত্তা শুধু দেয়াল বা পাহারা নয়; এটি মানসিক সুস্থতা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সমন্বিত ফল। যতদিন আমরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষ, অবহেলা, অপমানবোধ কিংবা মানসিক সংকটগুলোকে অদৃশ্য বা তুচ্ছ বলে এড়িয়ে যাব, ততদিন এমন মর্মান্তিক ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে। অনেক সময় বাহ্যিক কাঠামো স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে ক্ষত তৈরি হয়; সেই অদৃশ্য ক্ষতগুলোই একসময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান বিতরণের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষ গড়ার জায়গা। তাই এখানে শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। এমন এক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবাই নিজের কথা নির্ভয়ে বলতে পারে, ন্যায্যতার প্রতি আস্থা রাখতে পারে এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সত্যিকার অর্থে আলোকিত হবে, যখন তা জ্ঞানের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও মানবিক নিরাপত্তারও আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে।

লেখক:

ড. এম এম রহমান

প্রফেসর, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

ই-মেইল: mijan@jkkniu.edu.bd, mijanjkkniu@gmail.com

শেয়ার করুন...

অন্যান্য...