নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) এর জুলাই শহীদ স্মৃতি ছাত্রী হলে নামাজের জন্য নির্ধারিত কক্ষের মাঝখানে আলমারি বসিয়ে সেটিকে দুইটি গণরুমে রূপান্তরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদন হল প্রভোস্ট বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে পূর্বের নামাজ কক্ষ পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হলের ২য় তলায় পূর্বে ২২২ ও ২২৩ নম্বর কক্ষ নামাজ রুম হিসেবে নির্ধারিত ছিল। সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হতো। তবে সিট সংকটের কথা উল্লেখ করে পূর্বের হল প্রভোস্ট নামাজ কক্ষটিকে গণরুম হিসেবে ব্যবহার শুরু করা হয়। বর্তমানে রিডিং রুমের এক কোণায় নামাজের জন্য সামান্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একসঙ্গে অনেকের ইবাদতের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে ধর্মীয় চর্চা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৫তম ব্যাচের এক ছাত্রী জানান, হলে ওঠার আগে থেকেই ২২২ ও ২২৩ নম্বর কক্ষ নামাজ রুম হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু হলে ওঠার পর সেটি গণরুমে রূপান্তর করা হয়। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রভোস্টকে জানানো হলে তিনি দাবি করেন, কক্ষ দুটি মূলত স্পোর্টস রুম হিসেবে পরিকল্পিত ছিল এবং দরজায় ভুলবশত নামাজ রুম লেখা হয়েছিল। পরে লিখিত আবেদন দেওয়া হলে বর্তমান প্রভোস্ট চার মাস সময় চান এবং আশ্বাস দেন গণরুমের শিক্ষার্থীদের অন্যত্র স্থানান্তর করে কক্ষটি নামাজ রুম হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৫তম ব্যাচের অন্য আরেকজন ছাত্রী বলেন – হলের ২য় তলায় আগে একটি নির্ধারিত নামাজ কক্ষ ছিল, যেখানে নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত হতো। এখন সেটি গণরুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রিডিং রুমের এক কোণায় অপ্রতুল জায়গায় নামাজ আদায় করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টকর। বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও সমাধান হয়নি। আমরা পূর্বের নামাজ কক্ষটি পুনরায় চালুর দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে গনরুমে বসবাসকারী ১৯তম ব্যাচের এক ছাত্রী বলেন- গণরুম হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে। রুমে জানালা না থাকায় ২৪ ঘণ্টা লাইট ব্যবহার করতে হয় এবং দরজা খোলা রাখা যায় না, কারণ বিড়াল ঢুকে খাবার নষ্ট করে এবং বেডে অসুবিধা সৃষ্টি করে। জানালা না থাকার কারণে রুমটি বদ্ধ থাকে, যা দমবন্ধ লাগার মতো অনুভূতি ও দুর্গন্ধের সমস্যা তৈরি করে।
গনরুমে থাকা ২০তম ব্যাচের আরেক ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন – রুমে সুইচবোর্ডের স্বল্পতার কারণে অনেক মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করতে হচ্ছে। রুমটি দুই ভাগে আলমারি দিয়ে ভাগ করা হয়েছে, যার ফলে এক পাশের কথা অন্য পাশে শোনা যায়, ঠিকমতো ঘুম হয় না এবং মাইগ্রেন সমস্যায় ভোগা শিক্ষার্থীরা আরও কষ্ট পাচ্ছেন। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। এছাড়া চলাফেরার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, যা দৈনন্দিন জীবনকে আরও অসুবিধাজনক করে তুলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় নামাজের জন্য নির্ধারিত কক্ষটি পুনরায় চালুর দাবিতে প্রায় ২০০ ছাত্রী হল প্রভোস্টের কাছে একটি লিখিত আবেদন করে। আবেদনটিতে বলা হয়,বর্তমানে পড়ার রুমের একপাশে নামাজের ব্যবস্থা থাকায় নামাজ, কুরআন প্রশিক্ষণ ও ইসলামিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার সময় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মনোযোগে বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর তুলানায় জায়গাটি অপ্রতুল হওয়ায় একসাথে অনেক শিক্ষার্থীর জায়গা হয় না।এছাড়া আবেদনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও সহমত প্রকাশ করে স্বাক্ষর করেছেন এবং আবেদনটি অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান প্রভোস্ট নাসির স্যার শুরুতে ২২৩ নম্বর কক্ষ দুই মাসের মধ্যে নামাজের জন্য দেওয়ার কথা জানালেও পরবর্তীতে সেই আশ্বাস ভুলে গিয়ে কক্ষটি দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ছাত্রী হলের প্রভোস্ট মো: নাসির উদ্দিন বলেন- রিডিং রুমের পাশে থাই গ্লাস দিয়ে পার্টিশন করে দীর্ঘদিন ধরে আংশিকভাবে নামাজের রুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল, যা আমার প্রভোস্ট হওয়ার আগের সময় থেকেই চালু ছিল। তবে এতে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছিল এবং সামনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে শব্দের কারণে সমস্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে গণরুমের একটি ৬ জনের কক্ষ ধাপে ধাপে খালি করে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে সংস্কার করে আলাদা নামাজ ও কুরআন শিক্ষার রুমে রূপান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে ২ জনকে স্থানান্তর করা হয়েছে, বাকি ৪ জনকে সিট খালি হলেই সরানো হবে। পূর্বে ১২ জনের কক্ষ আলমিরা দিয়ে ভাগ করে যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা প্রাইভেসি নষ্ট করেছে এবং বাস্তবসম্মত ছিল না। এখন একসঙ্গে ১২ জনকে সরানো কঠিন হওয়ায় ধাপে ধাপে সমাধান নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হল থেকে ডাবলিং পদ্ধতি বাতিল করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা খাট ও ব্যক্তিগত পরিসর নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডাবলিং শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযোগী নয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন- বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। আমি খোঁজ নিবো এবং শীগ্রই যেন আলাদা নামাজ কক্ষ তৈরি করে সেই ব্যবস্থা গ্রহন করবো।