মোছাঃ মাহমুদা আক্তার নাঈমা
জাককানইবি প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) যথাযথ মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য এবং আনুষ্ঠানিকতার সাথে পালিত হলো ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০:৩০ ঘটিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চুরুলিয়া মঞ্চে আলোচনা ও সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই কর্মসূচি।এরপর শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) প্রথম প্রহরে ভাষা শহিদদের স্মরণে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
এ পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম ভাষা শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক সমিতি, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীবৃন্দ ভাষা শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এই বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চুরুলিয়া মঞ্চে আয়োজিত আলোচনা সভায় দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন সেইসব শহিদদের যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাকে আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেয়েছি।তিনি বলেন,
“আমাদের চিরতরে পদানত করে রাখার জন্য পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বিভিন্ন ধরণের পন্থা অবলম্বন করেছিল, তার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো আমাদের মনের ভাব প্রকাশের যে বাহন তার উপর সুকৌশলে গভীর চক্রান্ত। পুরো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা ছিল বাংলা। এই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। আর পশ্চিম পাকিস্তানের মাত্র শতকরা ৭.২ ভাগ মানুষ অর্থাৎ এলিট শ্রেণির ভাষা ছিল উর্দু। উর্দু ও ইংরেজীকে যদি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে রাখা যায় তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হিসেবে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার আরও বেশি দাবি রাখে। কিন্তু তারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের চিরতরে পঙ্গু করে রাখতে চেয়েছিল। তারা আমাদের শেকড়ে হাত দিয়েছিল। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব দিক থেকেই আমাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। ভাষাগত কারণে চাকুরির ক্ষেত্রেও আমারা বৈষম্যের স্বীকার হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৪৭ সাল থেকেই আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। তবে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত সফলতায় পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলনে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনে সফলতা পেলেও বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ১৯৫২ সালে স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট ভাষার দাবিকে আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং ২০০৮ সালে জাতিসংঘ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলা ভাষা পৃৃথিবীতে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়।”
এছাড়া আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী ও কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন চারুকলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ এমদাদুর রাশেদ (রাশেদ সুখন), শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. তুষার কান্তি সাহা এবং রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. মো. মিজানুর রহমান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. আশরাফুল আলম। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত,শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০:৩০ ঘটিকায় নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং কালো পতাকা উত্তোলন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী।