মোঃ নূরে এলাহী
অ্যামাজন বনঘেরা ব্রাজিলের বেলেম শহরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (UNFCCC) ৩০তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-৩০) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বের ১৯৮টি দেশের প্রতিনিধিদল, রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং পরিবেশকর্মীরা এই বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
এ বছরে কার্বন নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন–প্রশমন পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর এবং প্যারিস চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা—এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বাড়ানো অর্থায়নও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে কপ–এর মতো বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা বাড়ছে। বেলেম শহরকে সম্মেলন উপযোগী করতে ব্যাপক গাছ কাটাসহ অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অনেকেই জলবায়ু নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন। পাশাপাশি কর্পোরেট প্রভাব, উচ্চ দূষণকারী দেশগুলোর নেতৃত্ব এবং অনেক প্রতিনিধির ভ্রমণ–কেন্দ্রিক অংশগ্রহণকে কপ-এর লক্ষ্যপূরণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্যারিস চুক্তিসহ পূর্ববর্তী সম্মেলনগুলোর অধিকাংশ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু–ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গবেষণা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজেটের সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশটি এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের ওপর স্পষ্টভাবে পড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া, পানির উৎসে দূষণ বৃদ্ধি, উপকূলে লবণাক্ততা বাড়া, বায়ুদূষণের তীব্রতা এবং ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি—এসব পরিস্থিতি জনজীবন ও অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিকল্পনা কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও সঠিক নজরদারি এখন অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে জলবায়ু বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডের প্রসার, শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বাজেটের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান করছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের নির্গমন, শিল্প এলাকার মান নিয়ন্ত্রণের অভাবসহ বহু কারণে বায়ুদূষণের পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—এখনই সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ঢাকার বসবাসযোগ্যতা চরম সংকটে পড়বে।
নদী ও খাল রক্ষা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। নগর উন্নয়ন ও বন্যা–জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে নদী–খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশকে আরও দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে বলে তারা মত দেন।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, সময় এসেছে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার। ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোলার, উইন্ড, বায়োগ্যাস ও হাইড্রোপাওয়ারের মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারি–বেসরকারি সমন্বয় এবং গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব।