নোবিপ্রবি প্রতিনিধি :
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাস যেন একদিনের জন্য পরিণত হয়েছিল বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জনপদে। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রূপ নেয় এক বর্ণিল মিলনমেলায়, যেখানে আনন্দ, ঐতিহ্য আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিশে তৈরি করে এক অভূতপূর্ব আবহ।
সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ থাকলেও বিকেলের দিকে তা ছাড়িয়ে যায় সব প্রত্যাশা। ক্যাম্পাসজুড়ে নামে মানুষের ঢল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা , কর্মচারী ,প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ নোয়াখালীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে মুখর। অনেকেই বলছেন, এমন প্রাণবন্ত ও জনাকীর্ণ নোবিপ্রবি এর আগে খুব কমই দেখা গেছে।
মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বইমেলা ও বৈচিত্র্যময় স্টলসমূহ। গ্রাম বাংলার বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, মাটির বিভিন্ন সামগ্রী ও নোয়াখালীর স্থানীয় খাবার সমূহ ইত্যাদি। নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটান এসব স্টলে। লোকজ হস্তশিল্প, গ্রামীণ খাবার এবং নানা ধরনের বইয়ের সমাহার দর্শনার্থীদের টেনে রাখে দীর্ঘ সময়।
এবারের পরিবেশনা মঞ্চের নাম ছিলো “নবোদয়”। পরিবেশনায় ছিলো নোবিপ্রবির বিভিন্ন ক্লাবের শিক্ষার্থীরা। নোবিপ্রবি এডভেঞ্চার ক্লাব, ধ্রুপদ , নোবিপ্রবি ডান্স ক্লাব, চিত্রকৃৎ, নোবিপ্রবি মান, শব্দকুটির, প্রেক্ষাপট নামক ছাত্র সংগঠন গুলো এ আয়োজন করে। মঞ্চজুড়ে চলতে থাকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। লোকসংগীত, নৃত্য, পালাগানসহ নানা পরিবেশনায় মুগ্ধ হয় দর্শকরা। প্রতিটি পরিবেশনা যেন তুলে ধরছিল বাংলার শেকড়ের গল্প গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
উৎসব ঘিরে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই এই আয়োজনকে নোবিপ্রবির ইতিহাসে অন্যতম সেরা বলে মনে করছেন।
নোবিপ্রবির শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী আলভী রহমান মিম বলেন, “আজকের নোবিপ্রবি যেন আর সেই চেনা ক্যাম্পাস নয় পুরোটা যেন রঙে, সুরে আর মানুষের ভালোবাসায় ভরা এক জীবন্ত বাংলার প্রতিচ্ছবি। বিকেলে যখন মানুষের ঢল নামলো, তখন মনে হচ্ছিলো আমরা যেন কোনো বড় শহরের উৎসবে আছি। এই আয়োজন আমাদের শেকড়কে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে।”
বিজিই বিভাগের শিক্ষার্থী গাজী আরিফুল ইসলাম তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “বৈশাখ মানেই গ্রামবাংলার ঘ্রাণ আজ সেটাই আমরা ক্যাম্পাসে পেয়েছি। স্টলগুলোতে ঘুরে ঘুরে, লোকজ গান শুনে, আর সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম। এমন আয়োজন বারবার হোক কারণ এটি শুধু আনন্দ নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ তৈরি করে।”
উৎসবে আগত এক দর্শনার্থী তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “নোবিপ্রবিতে আজ যে দৃশ্য দেখলাম, তা সত্যিই অভূতপূর্ব। মনে হচ্ছিলো পুরো ক্যাম্পাসটা যেন এক টুকরো গ্রামবাংলা।চারদিকে মানুষের হাসি, রঙিন পোশাক, আর লোকজ সংস্কৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতি। বিশেষ করে বিকেলের ভিড় আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। এমন আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে অনুভব করার একটি সুন্দর উপলক্ষ।”
এ আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা নোবিপ্রবির ছাত্র পরামর্শ বিভাগের পরিচালক বলেন, “নোবিপ্রবির সাতটি ক্লাবের সম্মিলিত উদ্যোগে আজকের এই বর্ণাঢ্য বাংলা নববর্ষ উদযাপন সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন সমন্বিত ও প্রাণবন্ত আয়োজন আমাদের ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক শক্তি ও সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের সার্বিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় অনুষ্ঠানটি যে এত সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমি সংশ্লিষ্ট সকল ক্লাব, সংগঠক এবং অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাদের উৎসাহ, শ্রম ও সৃজনশীলতা এই উৎসবকে করেছে অনন্য ও স্মরণীয়”।
সবশেষে বলা যায়, এবারের বৈশাখী আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয় এটি ছিল ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ, যেখানে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে একসঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে আনন্দ, সংস্কৃতি আর মানুষের মিলনগাথা।